ইউটিউবে ‘নাম্বার ওয়ান হিরো’ নামে একটি গান ওঠে

Loading...

 ইউটিউবে ‘নাম্বার ওয়ান হিরো’ নামে একটি গান ওঠে। পোড়া মন ২ ছবির সেই গানে দেখা যায় নবাগত চিত্রনায়ক সিয়ামকে। ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গানটিতে ৫ হাজার ৮০০টি মন্তব্য পড়েছে। সেই মন্তব্যের কাতারে গানটিতে থাকা নায়ক, সেই ছবি কিংবা গানের গায়ক-সুরকার-গীতিকারকে নিয়ে খুব কমই আলোচনা খুঁজে পাওয়া যায়। 

সাড়ে ৫ হাজার মন্তব্যের মধ্যে ৮০ শতাংশই একজন মানুষকে ঘিরে। যিনি এই পৃথিবীতে নেই। এই গানে যেন নতুনভাবে প্রাণ পেয়েছেন। তিনি হলেন অকাল প্রয়াত চিত্রতারকা সালমান শাহ। আজ তাঁর ২২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকেই উৎসর্গ করে তৈরি এ গান ও পুরো সিনেমাটি নিয়ে আমাদের বিশেষ আয়োজন। লিখেছেন আদর রহমান

ইউটিউবে ‘নাম্বার ওয়ান হিরো’ গানের নিচে আসা মন্তব্যগুলো একনজরে দেখতে গিয়ে কিছু লেখায় চোখ আটকে যায়। যেমন—নাজমুল হাসান নামের একজন লিখেছেন, ‘আমার কপাল খারাপ, সে চলে যাওয়ার পর আমি দুনিয়াতে এসেছি। তার পরেও সে আমার কাছে সেরাদের সেরা, অন্য কারও সঙ্গে তার তুলনা হয় না। নায়ক সালমান চির অমর।’ এমন হাজারো মন্তব্য, যার মধ্য দিয়ে এটা স্পষ্ট হয় যে দুই দশকের বেশি সময়েও সালমান শাহর শূন্যতা পূরণ হয়নি।

শূন্যতা পূরণ না হওয়ার কথাটি স্বীকার করলেন নায়ক সিয়াম আহমেদও। সালমান শাহকে শ্রদ্ধা জানিয়ে করা এ গান ও সিনেমা নিয়ে তাঁর স্মৃতি জানতে চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বললেন, ‘সালমান শাহ একজনই। কেউ তাঁর মতো হতে পারবে না। এখন হাজার হাজার মানুষের কাছে সালমান শাহ একটি আবেগের নাম।

এমনকি আমার কাছেও।’ সিয়াম নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান মনে করেন এই কারণে যে, নিজের প্রথম ছবিতেই তিনি তাঁর স্বপ্নের নায়ককে শ্রদ্ধা জানাতে পেরেছেন। অভিনয় দিয়ে, গান দিয়ে নিজেকে সালমান শাহর মতো না, সালমানের সেরা ভক্তের মতো তুলে ধরতে চেয়েছেন এ ছবিতে।

একই কথা পোড়া মন ২ ছবির পরিচালক রায়হান রাফিও বললেন। সালমান যখন মারা যান, তখন এই নির্মাতা তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। সালমান শাহ বড় বোনদের প্রথম প্রেম, এর বদৌলতে এই নায়কের সিনেমা-গান-নাচের সঙ্গে পরিচয় তাঁর। সেই থেকে সালমান শাহর প্রতি তাঁর এই মুগ্

রাফি জানান, যখনই ঠিক করা হয় পোড়া মন ২ ছবির মূল পাত্র হবেন বাংলা সিনেমার একজন মহাতারকার ভক্ত, তখনই কোনো দ্বিমত ছাড়া উঠে আসে সালমান শাহর নাম। অভিনেতা সিয়ামও এই নাম নিজের শৈশবের নস্টালজিয়ায় ফিরে যান। নতুন করে দেখে ফেলেন সালমান শাহর সব ছবি। কেয়ামত থেকে কেয়ামত দিয়ে শুরু করেন হোমওয়ার্ক। এরপর শুটিংয়ের আগ পর্যন্ত তা চলতেই থাকে। সিয়াম বলেন, ‘নাইনটিস কিড (শৈশব-কৈশোর যার নব্বই দশকে কেটেছে) হিসেবে সালমান শাহর সব ছবি আগেই দেখা ছিল। তবে সবই দেখেছি মুগ্ধ দর্শক হিসেবে।

পোড়া মন ২-এর জন্য ছবিগুলো আবার দেখতে হয়েছে একজন অভিনেতার দৃষ্টি থেকে। আর এভাবে দেখেও এই মহাতারকার প্রতি মুগ্ধতা আমার আরও বেড়েছে।’ মুগ্ধতা শুধু সিয়ামের নয়। সালমানে মুগ্ধ হয়েছেন ‘নাম্বার ওয়ান হিরো’ গানটির কোরিওগ্রাফার ভারতের জায়েশ প্রধান। যেদিন তিনি প্রথম এই গানের ধারণা (কনসেপ্ট) শোনেন ও সালমান শাহর বিভিন্ন পোস্টার ও সিনেমার দৃশ্য-নাচের ভিডিও দেখেন, সেদিন তিনিও বলতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, ‘এই অভিনেতার স্টাইল, ব্যক্তিত্ব, অভিব্যক্তি তো এখনকার অনেক তারকাও আয়ত্ত করতে পারেনি। তোমাদের এখানে এত আধুনিক নায়কও ছিলেন!’

‘নাম্বার ওয়ান হিরো’ গানে সালমান শাহর বড় বড় কাট–আউট ছবি, প্রেক্ষাগৃহের দেয়ালে টাঙানো হয়েছিল এ অভিনেতার বিচার চাই ছবির বিশাল ব্যানার, নতুন করে তৈরি করা হয়েছিল সালমানের নতুন ছবি মুক্তির প্রথম দিনের আবহ। সবই ছিল, শুধু রক্ত-মাংসের মানুষটারই অভাব ছিল সেটে।

সেদিনের সেই শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে রাফি বলেন, ‘মেহেরপুরে আমরা যে সিনেমা হলে এ গানটির শুটিং করি, সেই হলের মালিক এক অবাক করা তথ্য দেন আমাদের। বলেন, সালমান শাহর মৃত্যুর পর থেকে তাঁদের সিনেমা ব্যবসার মন্দা শুরু হয়। শুরু হয় অশ্লীল ছবি, কাটপিসের যুগ। একসময় ধুঁকতে ধুঁকতে বন্ধ হয়ে যায় তাঁদের হল।’ কিন্তু মজার ব্যাপার হলো যেই সালমানের চলে যাওয়ার পর রীতিমতো গ্রহণ লেগে হারিয়ে গিয়েছিল হলটা, সেই সালমানই বন্ধ হয়ে যাওয়া ওই হলে প্রাণ ফিরিয়ে দিলেন।

নির্মাতা জানালেন, এই গানের শুটিংয়ের জন্যই বিশেষভাবে মেহেরপুরের একটি চালের গুদামঘর, প্রায় এক যুগ আগে যেটা ছিল সিনেমা হল, সেটা আবার পুরোনো রূপে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। নতুন করে ঘষে-মেজে গুদামঘর থেকে আবারও প্রেক্ষাগৃহ বানানো হয় একে। সেই ভবনের গায়ে আবারও টাঙানো হয় সালমান শাহর সিনেমার ব্যানার। সেই স্মৃতি বলতে গিয়ে নস্টালজিক হয়ে পড়েন সিয়াম আহমেদ। বলেন, ‘সেদিন সবার উচ্ছ্বাস আর আনন্দ দেখে সত্যিই মনে হচ্ছিল সালমান শাহর নতুন কোনো ছবি বুঝি এসেছে। আমি যেন সত্যিই সেই নব্বইয়ের দশকে বেড়ে ওঠা এক যুবক, যে যুবক প্রিয় নায়ক সালমানের একটা ছবি দেখার জন্য দারুণ রোমাঞ্চিত!’

রাফি ও সিয়াম দুজনই জানান, সালমানকে শ্রদ্ধা জানিয়ে গানটির শুটিং যে প্রেক্ষাগৃহে করা হয়েছিল, সেখানে আবার নতুন করে ছবির প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। পোড়া মন ২ ছবির প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়া এ ছবিটি দিয়েই সেখানে নতুন করে সিনেমার প্রদর্শনী শুরু করে।

শুধু এখানেই শেষ নয়। নির্মাতা ও অভিনেতা দুজনই সালমান-ভক্তদের জন্য এক অজানা তথ্য জানালেন। বললেন, সালমান শাহকে শ্রদ্ধা জানাতে শুধু ‘নাম্বার ওয়ান হিরো’ গানটিই নয়, তাঁর আরও একটি গান তৈরি করছিলেন। কিন্তু সময়স্বল্পতার কারণে সে গানের শুটিং আর করতে পারেননি।

সেই গানটি ইলেকট্রনিক ড্যান্স মিউজিক (ইডিএম) ধারায় তৈরি করেছেন তরুণ সংগীত পরিচালক ‘লোকাল বাস’ খ্যাত প্রীতম হাসান। পরিচালক জানান, খুব ইচ্ছা তাঁর সময় ও সুযোগ পেলে সে গানটিরও ভিডিও তৈরি করে শ্রদ্ধা জানাবেন প্রিয় নায়ক সালমান শাহকে। একই ইচ্ছা সিয়ামের। তিনি বলেন, ‘সালমান-ভক্তদের বলব, আমাদের জন্য দোয়া করবেন, যেন আমাদের সামর্থ্য হয় সালমান শাহকে উৎসর্গ করে বানানো অপ্রকাশিত এই গানটির ভিডিও শিগগিরই আপনাদের সামনে নিয়ে আসার।’