Notunshokal.com
এক্সক্লুসিভ

ঢাকা এখন আন্তর্জাতিক ধর্মীয় পর্যটন নগরী

মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ: বাংলাদেশের সংবিধানের ৫(ক) অনুযায়ী ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী। আর ২০১৯ সালের জন্য ঢাকাকে ওআইসি পর্যটন নগরী ঘোষণা করেছে। ২০১৮ সালের শুরুর দিকে দশম ইসলামিক কনফারেন্স অব ট্যুরিজম মিনিস্টার্সের সভায় ঢাকা এ বিশেষ গৌরব ও সম্মান অর্জন করে। ওআইসি সদস্যভুক্ত চারটি দেশকে টপকে এ সিটি অব ট্যুরিজমের মর্যাদা লাভ করে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা।

ভবিষ্যতে বিশ্বের পর্যটকদের কাছে অন্যতম পছন্দের গন্তব্য হবে বাংলাদেশ। এ জন্য ওআইসির ১৩০ কোটি টাকা আর্থিক সহায়তার আওতায় ইসলামী ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফলে ঐতিহ্যবাহী মসজিদগুলোর সংস্কার ও সজ্জিতকরণ সম্ভব হবে। এতে ওআইসি সদস্যভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে এবং পারস্পরিক সম্পর্কোন্নয়ন ঘটবে। ঢাকার পর্যটনগত ধর্মীয় গুরুত্ব বাড়বে, বাড়বে ঢাকা ভ্রমণের আগ্রহ। অন্যদিকে ওআইসির অঙ্গসংগঠন ইসলামিক এডুকেশনাল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশন ২০১২ সালের জন্য ঢাকাকে ইসলামী সংস্কৃতির এশীয় অঞ্চলের রাজধানী ঘোষণা করে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব ও ঢাকার মর্যাদা তৈরি করেছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পর্যটন গবেষক শারমিন সুলতানার মতে, ‘বাংলাদেশে ধর্মীয় ট্যুরিজমের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে, মসজিদগুলো পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান। অন্যদিকে বাংলাদেশে হয় বিশ্ব ইজতিমা। এতেও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।’ এ জন্য তিনি ভিসা জটিলতা দূর ও বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিংয়ে গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেছেন।

অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, বিশ্বে ৫৭টির মতো মুসলিম দেশে ১৬০ কোটি মুসলমান রয়েছেন। মুসলিম ঐতিহ্য দর্শনে আগ্রহী এ জনগোষ্ঠীকে ভ্রমণে উৎসাহিত করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নই হচ্ছে পর্যটন নগরী ঘোষণার মূল তাৎপর্য। তাঁর মতে, বিষয়টি হচ্ছে একটি শহরকে ফোকাস করা এবং বিশ্বব্যাপী ইসলামী কৃষ্টি-সংস্কৃতির গুরুত্ব বৃদ্ধি করা।

ঢাকাকে ওআইসি পর্যটন নগরী ঘোষণার তাৎপর্য লুকিয়ে আছে ঢাকার সোনালি ঐতিহ্যের আড়ালে। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর ১৬ জুলাই ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে ঢাকাকে সুবা বাংলার রাজধানীর মর্যাদা দিয়ে ফরমান জারি করেন। সুবেদার ইসলাম খান চিশতি ঢাকার গোড়াপত্তন করেন এবং মোগল সম্রাটের নামে রাজধানীর নামকরণ করা হয় ‘জাহাঙ্গীরনগর’। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, সম্রাট জাহাঙ্গীরের ফরমান জারিতে ঢাকের বাজনার মাধ্যমে আনন্দ প্রকাশ করা হলে, লোকমুখে ওই বাদ্য-বাজনা কিংবদন্তির রূপ নেয় এবং শহরের নাম হয়ে যায় ঢাকা। তবে ঢাকার নামকরণ নিয়ে একাধিক মতামত রয়েছে।

১৬৫০ সালে সুবেদার শাহসুজা রাজমহলে রাজধানী স্থানান্তর করলে ঢাকার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। ১৬৬০ সালে সুবেদার মির জুমলা আবার রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করেন। ১৭১৭ সালে সুবেদার মুর্শিদ কুলি খাঁ রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করেন। ১৯০৫ সালে ঢাকাকে আবার আসাম ও বাংলার রাজধানী করা হলেও পরে ১৯১১ সালে রাজধানী কলকাতায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ঢাকা হয়ে যায় প্রাদেশিক রাজধানী।

ঢাকাকে কেন্দ্র করেই ৫২, ৫৪, ৬২, ৬৬, ৬৯, ৭০ ও ৭১-এর কালপরিক্রমায় রক্তঋণে অর্জিত হয় আমাদের স্বাধীনতা এবং লাল-সবুজের বিজয় পতাকা। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পর্যটন গুরুত্বের অন্যতম আকর্ষণ ঢাকার মসজিদ স্থাপত্য। ‘মসজিদের শহর’ ঢাকায় ১০ হাজার মসজিদ রয়েছে (ই.ফা.বা. : দৈনিক ইত্তেফাক, ০৭.১২.১৪)

‘বিনত বিবির মসজিদ’ পুরান ঢাকায় অবস্থিত মধ্যযুগীয় অন্যতম মসজিদভিত্তিক স্থাপত্য। বাংলার সুলতান প্রথম নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহর শাসনামলে অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৬০০ বছর বা ইসলাম খাঁর আগমনের দেড় শ বছর আগে মসজিদটি নির্মিত হয়। শিলালিপি অনুসারে মসজিদটি ১৪৫৬-১৪৫৭ সালের বা ৮৬১ হিজরি সালের। পুরান ঢাকার ০৬ নম্বর নারিন্দা রোডের সুপ্রাচীন ‘হায়াৎ বেপারির পুলের’ উত্তর দিকে ‘বিনত বিবির মসজিদ’ অবস্থিত। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন রচিত ‘ঢাকা : স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী’ (তৃতীয় সংস্করণ, জানু.-২০০৪, অনন্যা প্রকাশনালয়, ঢাকা, পৃ.-১৮০) এবং বাংলা পিডিয়াসহ বিভিন্ন সূত্রের তথ্যে অনুমিত, বিনত বিবির মসজিদই ঢাকার সবচেয়ে পুরনো মুসলিম স্থাপত্য নিদর্শন ও শহরের প্রথম মসজিদ। ছয় থেকে সাত কাঠা জায়গায় গড়ে ওঠা চারকোনাবিশিষ্ট মসজিদটির আদি গঠনশৈলীতে একটি কেন্দ্রীয় গম্বুজ থাকলেও বাংলা ১৩৩৭ সালে (১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ) দ্বিতীয়বার সংস্কারকালে আরো একটি গম্বুজ যুক্ত করা হয়, যা মসজিদটির বিবর্তন ও সম্প্রসারণের স্পষ্ট ধারণা দেয়। মসজিদের দেয়ালে স্থাপিত একটি কালো পাথরে ফারসি ভাষায় লিখিত বর্ণনায় রয়েছে, সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহর আমলে আরকান আলী নামের এক পারস্য সওদাগর ব্যাবসায়িক প্রয়োজনে ঢাকার নারিন্দায় বসবাস শুরু করেন এবং তিনিই ৩০-৪০ জন মুসল্লির ধারণক্ষমতাসম্পন্ন বিনত বিবির মসজিদটি নির্মাণ করেন। ঢাকায় বসবাসকালেই আরকান আলীর অতি আদরের কন্যা বিনত বিবির আকস্মিক মৃত্যু হয় এবং তাকে ওই মসজিদসংলগ্ন স্থানে সমাহিত করা হয়। কন্যার আকস্মিক মৃত্যুতে শোকে-দুঃখে পিতা আরকান আলীও ছয় মাস পর মৃত্যুবরণ করলে তাঁকেও কন্যার পাশেই ওই মসজিদসংলগ্ন স্থানে সমাহিত করা হয়। অন্য একটি বর্ণনা মতে, মাহরামাতের কন্যা মুসাম্মাত বখত বিনত বিবি মসজিদটি নির্মাণ করান।

‘বিনত বিবির মসজিদ’ ছাড়া ঢাকায় অসংখ্য প্রাচীন মসজিদ রয়েছে। প্রশ্ন জাগে, তবে কি এর আগে ঢাকায় মসজিদ ছিল না? এর জবাব হলো, আমরা মূলত মুসলিম স্থাপত্যধারায় বিকশিত ইতিহাসের টিকে থাকা অংশের দিকে তাকিয়েছি। প্রত্যাশায় রইলাম ভবিষ্যতের গবেষণায় আমরা পৌঁছব অনাবিষ্কৃত মহাসত্যের আরো গভীরে। যেমন—ড. আবদুল করিমের ‘মোগল রাজধানী ঢাকা’ বই এবং আরো অন্য অনেকের মতে, ঢাকার মুগদার মাণ্ডা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ‘মাণ্ডা মসজিদ’। শিলালিপি অনুযায়ী ‘মাণ্ডা মসজিদ’ ১৪৩৩ সালের জানুয়ারিতে নির্মিত। ঐতিহাসিক ‘মাণ্ডা মসজিদ’ বর্তমানে ‘নান্দু ব্যাপারী মসজিদ’ নামে পরিচিত। ‘আহমদ হাসান দানি ও আবদুল করিমের মতে, বিলুপ্ত দোলাই নদীর তীরে ছিল মাণ্ডার অবস্থান। সুলতানি ও মোগল আমলে দোলাই নদী ছিল ঢাকার অন্যতম নৌপথ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. হাবিবা খাতুনের ডক্টরাল থিসিসে এ মসজিদের বর্ণনা আছে। তিনি জানান, ১৯৮২ সালে তিনি মসজিদটি পরিদর্শন করেন। তখন মসজিদের স্থাপত্যশৈলী দেখে তিনি নিশ্চিত হয়েছিলেন, এটি সুলতানি আমলের মসজিদ। মসজিদটিতে আগে গম্বুজ ছিল। গম্বুজ ভেঙে পড়লেও মসজিদে সুলতানি আমলের আদি কাঠামোর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল।

ঢাকার অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন চকবাজার জামে মসজিদ। সুবেদার শায়েস্তা খাঁ ১৬৭৬ সালে মসজিদটি নির্মাণ করেন। নির্মাণশৈলীর কারণে যা কিনা ‘আবাসিক মাদরাসা মসজিদ’। মোহাম্মদপুর এলাকায় অবস্থিত ঢাকার ঐতিহ্য ‘সাত গম্বুজ মসজিদ’ নির্মিত হয় ১৬৭৬-১৬৮০ সালে। ব্যস্ত ঢাকার কারওয়ান বাজারে খাজা আম্বর ১৬৮০ সালে, মতান্তরে ১৬৭৭-৭৮ সালে যে মসজিদ নির্মাণ করেন, তা ‘আম্বর শাহ’ মসজিদ নামে সুপরিচিত। মোগল স্থাপত্যের নির্মাণশৈলীর একমাত্র উল্লেখযোগ্য সুবৃহৎ নিদর্শন ‘লালবাগ শাহী মসজিদ’। সুবেদার আজিমুশশানের প্রিয় শাহজাদার নামে একে ‘ফারুক সিয়ার মসজিদ’ও বলা হয়। মসজিদটি ১৭০৩-০৪ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়। মসজিদের সাদা ধবধবে গম্বুজে অসংখ্য তারার ‘মোটিফ’-এর কারণে ঢাকার গর্ব তারা মসজিদ। নির্মাতার নামে মসজিদটিকে (মির্জা গোলাম পীর, মৃত. ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ) ‘মির্জা সাহেবের মসজিদ’ও বলা হয়। আরমানিটোলার আবুল খায়রাত রোডে অবস্থিত মসজিদটি সম্ভবত উনিশ শতকের শুরুতে নির্মিত। এ ছাড়া ঢাকার অন্যতম মসজিদের তালিকায় আছে—ইসলাম খান মসজিদ (১৬৩৫-৩৯ খ্রিস্টাব্দ) শায়েস্তা খান মসজিদ (১৬৬৪-৭৮ খ্রিস্টাব্দ) খাজা শাহবাজ মসজিদ (১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দ) আজিমপুর মসজিদ (১৭৪৬ খ্রিস্টাব্দ) আল্লাকুরি মসজিদ (মোহাম্মদপুর), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ, গাউসুল আজম মসজিদ ইত্যাদি।

ঢাকায় রয়েছে বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান।

ওসমানী উদ্যান ও বিবি মরিয়মের কামান

সুবেদার মির জুমলার ১৬৬১ সালে আসাম অভিযানে ব্যবহৃত ৬৭৫টি কামানের মধ্যে ‘বিবি মরিয়ম’ ছিল সর্ববৃহৎ। ‘বিবি মরিয়মে’র দৈর্ঘ্য ১১ ফুট ও মুখের ব্যাস ৬ ইঞ্চি। যুদ্ধজয়ের স্মৃতি হিসেবে ‘বিবি মরিয়ম’কে প্রথমে বড় কাটরার দক্ষিণে সোয়ারীঘাটে স্থাপন করা হয়। তখন কামানটি মির জুমলার কামান হিসেবে পরিচিতি পায়। ১৮৪০ সালে ‘বিবি মরিয়ম’কে চকবাজারে স্থাপন করা হয়। ১৯২৫ সালে ‘বিবি মরিয়ম’ আসে সদরঘাটে। গত শতাব্দীর মাঝামাঝি ‘বিবি মরিয়ম’ চলে আসে গুলিস্তানে। ১৯৮৩ সালে ‘বিবি মরিয়ম’ স্থাপিত হয় ওসমানী উদ্যানে।

আহসান মঞ্জিল

বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী কুমারটুলীতে আহসান মঞ্জিল অবস্থিত। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি বিনোদনের জন্য শেখ ইনায়েতুল্লাহ আহসান মঞ্জিলের বর্তমান স্থানে একটি রংমহল বানান। ভবনটি পরবর্তীকালে বিভিন্ন হাত ঘুরে নবাব আবদুল গনির হাতে আসে। ১৮৫৯ থেকে ১৮৭২ সালের মধ্যে ভবনটির পুনর্নির্মাণ শেষ করেন নবাব আবদুল গনি এবং নিজের ছেলের নামে ভবনটির নামকরণ করেন আহসান মঞ্জিল। এখানে নবাব আহসানউল্লাহ বাস করতেন। আহসান মঞ্জিলের দুটি অংশ ‘রংমহল’ ও ‘অন্দরমহল’। বর্তমানে আহসান মঞ্জিল প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীন একটি জাদুঘর।

বড় কাটরা, ছোট কাটরা

১৬৪৪ সালে চকবাজারের দক্ষিণে বুড়িগঙ্গার দিকে মুখ করে দেওয়ান আবুল কাশেম শাহ সুজার বাসস্থান নির্মাণ করেন। তখন থেকেই ভবনটিকে বড় কাটরা বলা হয়। তবে শাহ সুজা এ ভবনে বাস করেননি। আশ্রয়হীন, পথিক, মুসাফিরদের জন্য ব্যবহৃত হতো বড় কাটরা। বর্তমানে এখানে একটি মাদরাসা গড়ে উঠেছে।

বড় কাটরার অনতিদূরেই নির্মিত হয় ছোট কাটরা। ১৬৬২ থেকে ১৬৭১ সালে শায়েস্তা খাঁ ছোট কাটরা নির্মাণ করেন। এখন ছোট কাটরা অবৈধ দখলদারকবলিত। লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর।

আরও পড়ুন

হারিয়ে যাওয়া আটলান্টিস শহরের খোঁজ মিলেছে সাহারা মরুভূমিতে!

Adnan Opu

স্বর্ণ দিয়ে বাঁধাই করা কোরআনটি ধরতেই চোরের কানে এলো আজান!

Adnan Opu

সুইসাইড নোটের দাম প্রায় ২ কোটি টাকা!দেখে নিন কী রয়েছে সেই লেখায়?