খেলাধুলা

পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে শেষ পর্যন্ত আইএমএফের দ্বারস্থই হতে হচ্ছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে শেষ পর্যন্ত আইএমএফের দ্বারস্থই হতে হচ্ছে। তিনি আইএমএফের ঋণ নেয়ার বেদনা সম্পর্কে ভালোভাবেই অবহিত। আর এ জন্য এর বিকল্প সব পথেই তিনি যেতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কোনো পথ এখন মনে হচ্ছে তার জন্য খোলা নেই। ফলে কয়েক মাস আগে নির্বাচনে জেতার জন্য যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, তার বিপরীত পথেই তাকে পা বাড়াতে হচ্ছে।

পাকিস্তান এখন এমন এক ব্যালেন্স অব পেমেন্ট বা লেনদেনের ভারসাম্য সঙ্কটের প্রান্তে রয়েছে, যা তার মুদ্রার স্থায়িত্ব এবং ঋণ পরিশোধ বা আমদানির জন্য অর্থ প্রদানের সামর্থ্যকে সঙ্কটে ফেলেছে। দেশটির বাজেট ঘাটতি গত পাঁচ বছরে জিডিপির চার শতাংশ থেকে দশমিক ১০ শতাংশ বেড়েছে।

আমদানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক ব্যয় বেড়েছে। স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৭ সালের জুলাই থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত দেশের আমদানির প্রায় ৭০ শতাংশ জ্বালানি, যন্ত্রপাতি ও ধাতুর জন্য ব্যয় হয়েছে। অন্য দিকে, রফতানি আয়Ñ প্রধানত টেক্সটাইলেÑ সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আট বিলিয়ন ডলারে হ্রাস পেয়েছে। যা দিয়ে দুই মাসের কম আমদানি বিল মেটানো যাবে। এর মধ্যে মুদ্রাস্ফীতি বেড়েই চলেছে।

অর্থনীতিতে এখন যে সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে তা ইমরান খানের জন্য হয়নি। পাকিস্তান মুসলিম লীগÑ নওয়াজের (পিএমএল-এন) নেতৃত্বে তার পূর্ববর্তী সরকার বার্ষিক জিডিপি বৃদ্ধির হার ১০ বছরের বেশি সময়ে সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশে উন্নীত করেছেন। কিন্তু তেল ও যন্ত্রপাতির ব্যয়বহুল আমদানি এর পেছনে ছিল, যার পাকিস্তানি রুপিতে যেভাবে পড়েছে তা টেক্সটাইলের মতো রফতানি শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এর ফলে ২০১৬ সালের শুরু থেকে চলতি হিসাবের ঘাটতি নাটকীয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তীব্রভাবে পতিত হয়েছে। রিজার্ভ এখন যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে তাতে বছরের শেষ নাগাদ তা আমদানি বিল এবং বৈদেশিক দায়দেনা পরিশোধের জন্য যথেষ্ট থাকবে না। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের এখন ১০ বিলিয়ন ডলার জরুরি ঋণ প্রয়োজন।

ইমরান খান নিজেও দেখছেন যে, পাকিস্তানের সঙ্কট উত্তরণে জরুরি ঋণের প্রয়োজন। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি আইএমএফের বিকল্পের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছেন। এক টেলিভিশন বক্তৃতায় তিনি বিদেশে বসবাসরত সব পাকিস্তানি নাগরিককে এক হাজার ডলার করে দান করতে বলেছিলেন সরকারকে। একটি বড় বাঁধের জন্য অর্থের জোগান দিতে তিনি এই আহ্বান জানান। সরকারি তহবিল আর অপচয় করা হবে না তা দেখানোর জন্য, তিনি প্রধানমন্ত্রীর ৬১টি বিলাসবহুল গাড়ি এবং বাসার জন্য দুধ সরবরাহে পোষা আটটি গরু নিলাম করেছেন।

জনাব খান গত ৭ অক্টোবর আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, ‘বন্ধু দেশ’ ঋণের দায় শোধ স্থগিত করবে যাতে আইএমএফের দিকে তাকে যেতে না হয়। জনাব খান বিশেষভাবে বিদেশ সফরকালে সৌদি আরবকে এ ব্যাপারে আহ্বান জানান। কিন্তু সৌদিরা কোনো ধরনের পুনরুদ্ধার সহায়তার প্রস্তাব দেয়নি। এর পরিবর্তে, তারা চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোরে (সিপিইসি) বিনিয়োগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করে যেটি মূলত চীনের ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আর্থিক সহায়তায় বাস্তবায়ন হচ্ছে। বাণিজ্য উপদেষ্টা আবদুল রাজ্জাক দাউদের মতে, এটি ‘ভিক্ষার চেয়েও ভয়াবহ’ ছিল। কিছু পর্যবেক্ষক মনে করেছিলেন যে, আইএমএফের পরিবর্তে চীন সিপিইসি এর জন্য তার ঋণ বৃদ্ধি করতে পারে। কিন্তু সে রকম সাড়া এখনো দেখা যাচ্ছে না। এই প্রকল্পের বিস্তারিত বিবরণ জনগণের কাছে প্রকাশ করা হয়নি তবে এর শর্ত পাকিস্তানের জন্য প্রতিকূল বলে অনেকে মনে করেন। সিপিইসিকে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য এখন যথেষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে না। এ ছাড়া যেকোনো কারণেই হোক চীন পাকিস্তানের নতুন সরকারের ওপর খুব বেশি সুপ্রসন্ন বলেও মনে হচ্ছে না। সেনাবাহিনী প্রধানের চীন সফরের পর প্রধানমন্ত্রী নিজেই বেইজিং যাবেন। এই সফরে কতটা কি হয় সেটি দেখার বিষয়।

১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে পাকিস্তান বারবার আইএমএফের কাছে গেছে। ২০১৩ সালে শেষবারের মতো ইসলামাবাদ একই ধরনের সঙ্কট মোকাবেলায় ৬.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ পেয়েছিল এ সংস্থা থেকে। করাচিভিত্তিক পরামর্শক সংস্থা ইনসাইট সিকিউরিটিজের পরিচালক জেশান আফজাল বলেন, এখন দেশের সঙ্কট উত্তরণে ‘অন্তত ১২ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা প্রয়োজন’। এই অঙ্কের ঋণ অনুমোদিত হলে এটি হবে দেশের সর্ববৃহৎ পুনরুদ্ধার কর্মসূচি।

তবে ২০১৩ সালের তুলনায় যেকোনো নতুন আইএমএফ পুনরুদ্ধার ঋণের শর্ত কঠোর হবে। কারণ তহবিলের বৃহত্তম দাতাদের মধ্যে ওয়াশিংটনের সাথে ইসলামাবাদের সম্পর্কে টানাপড়েন রয়েছে। এর মধ্যে আমেরিকা সতর্ক করে দিয়েছে যে, দেশটি চীনকে ঋণ পরিশোধের জন্য আইএমফের অর্থ যাতে ব্যবহার না করে তা নিশ্চিত করার জন্য এর ওপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখবে।

পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ইসলামি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবেন তিনি। আর এখন তিনি অর্থনৈতিক সঙ্কট উত্তরণের জন্য যে আইএমএফের দিকে যাচ্ছেন, তার শর্ত পূরণ আর কল্যাণমূলক তথা জনতুষ্টির ব্যবস্থা যে একসাথে যাবে না, তাতে সংশয়ের কিছু নেই। সম্ভাব্য এই ব্যবস্থায় জনগণের ওপর নতুন নতুন কর আরোপিত হবে, ভর্তুকি প্রত্যাহার করা হবে, লোকসানী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বেসরকারি মালিকানায় ছেড়ে দেয়া হবে। জনজীবনে এর প্রত্যক্ষ বিরূপ প্রভাব পড়বে।

নির্বাচনের সময় ইমরান খান নিজেকে নতুন পাকিস্তানের জন্য পশ্চিমের হাত থেকে বেরিয়ে আসতে দেশটির আসক্তি ভাঙার একজন মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। পূর্ববর্তী সরকারগুলো তহবিলের জন্য যে আইএমএফের কাছে ধরনা দিতেন তার সমালোচনা করে তিনি বলেছিলেন, তার পাকিস্তান মুভমেন্ট ফর জাস্টিসের (পিটিআই) পরিবর্তে বিদেশে লুকানো কোটি কোটি ডলার পুনরুদ্ধারের ওপর ফোকাস করবে। কিন্তু অফিসে বসার দুই মাসেরও কম সময় পরে ৮ অক্টোবর জনাব খান নিজেকে উল্টে দেন। তার অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে, সরকার আইএমএফ থেকে বড় অঙ্কের ঋণ চাইবে।

পাকিস্তান অভ্যন্তরে ও বাইরে পাকিস্তানি অর্থনীতির সমস্যাগুলোর জন্য চীনকেও আংশিকভাবে দায়ী করা হয়। তারা যুক্তি দেয় যে, চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর (সিপিইসি) প্রকল্পের জন্য চীনের উপকরণগুলোতে পাকিস্তানের উচ্চ আমদানি ব্যয়ের ফলে লেনদেনে খারাপ ভারসাম্য পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সিপিইসি চীনা নেতৃত্বের উচ্চাভিলাষী পরিবহন এবং শক্তি প্রকল্প যার আওতায় পাকিস্তানে অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি খরচ হচ্ছে। এটি বেইজিংয়ের বৃহত্তর বেল্ট এবং রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অংশরূপে তৈরি হচ্ছে।

সিপিইসির অংশ হিসেবে, চীন পাকিস্তানকে ঋণ দেয়, যা দিয়ে চীন থেকে সরঞ্জাম ও সেবা আমদানি করা হয়। এটি পাকিস্তানের ঋণ দায়ে যুক্ত হয় এবং বর্তমান হিসাবের ঘাটতিকে আরো বাড়িয়ে দেয়। বিনিয়োগের বিবেচনা হিসাব করা হলে সিপিইসিতে পাকিস্তানি অর্থনীতির উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু পর্যবেক্ষকরা বলছেন যে, চীনের ঋণের বেশির ভাগ শর্তাবলি অস্পষ্ট এবং কিছু ঋণের সুদের হার পাকিস্তানের বাস্তবতার তুলনায় বেশি হতে পারে।

পাকিস্তানে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা ভীত হয়ে পড়ছে। অক্টোবরের ৮ তারিখে শেয়ারবাজারে এক দশকের মধ্যে সর্বকালের সবচেয়ে বেশি দরপতনের ঘটনা ঘটেছে। এই অবনতিশীল অবস্থা এবং সরকারের মধ্যকার নানা সংশয় আইএমএফের সাথে আলোচনায় পাক অবস্থানকে দুর্বল করছে। আইএমএফের শর্তে সিপিইসি চুক্তিতে স্বচ্ছতার প্রতি নজর দেয়ার পাশাপাশি পাকিস্তান যাতে দেয়া ঋণ ফেরত দিতে পারে সেজন্য টাকার আরো অবমূল্যায়ন, রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি এবং সুদের হার বাড়ানোর শর্ত থাকতে পারে। এসব শর্তের বাস্তবায়ন কোনোভাবে জনগণকে তুষ্ট করার সম্ভাবনা নেই।

এর সাথে জনাব খানের ‘ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্র’ সৃষ্টির অঙ্গীকারের মিল পাবে না দেশের মানুষ। ইমরান খান ক্ষমতায় আসার আগে না হলেও নিশ্চয়ই এখন বুঝতে পারছেন যে পাকিস্তানের সমস্যাগুলো দুর্নীতিবাজ নেতৃত্বের চেয়ে অনেক বেশি গভীরতর। তার আত্মবিশ্বাস এবং তারকা শক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই সঙ্কটের সমাধান করা সহজ হবে না। এর সাথে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতার সংস্কার যেমন সম্পর্কিত তেমনিভাবে দেশটির কৌশলগত নীতি ও পররাষ্ট্র সম্পর্কের সম্পৃক্ততাও রয়েছে। চাইলেই পাকিস্তান একবার চীন আরেকবার আমেরিকার দিকে ঝুঁকে যেতে পারে না। দেশটির চীনা বিনিয়োগ যেমন প্রয়োজন তেমনি দরকার পাশ্চাত্যের বাজার ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান। ফলে এক ধরনের ভারসাম্যের পথে তাকে এগোতে হবে। আইএমএফের দ্বারস্থ হয়ে এই ভারসাম্য কতটা ইমরান খান রক্ষা করতে পারেন সেটিই হলো বড় প্রশ্ন।