রাজনীতি

এবার ১০% আসন,মাত্র ৬ পরিবারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এক পরিবার থেকে একাধিক ব্যক্তিকে নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। শুধু পরিবারের সদস্য নন, সেই সাথে শীর্ষ নেতৃত্বের আত্মীয়-স্বজনরাও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। সাধারণত উপমহাদেশের রাজনীতি পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ফলে একজনের পরিবর্তন হলে অন্যজন হাল ধরেতে পারবেন।

সেই হিসেবে বাংলাদেশের রাজনীতি অনেকটাই পরিবার-আত্মীয়দের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। দেখা গেছে, একই পরিবারের সদস্য বা আত্মীয় ভিন্ন ভিন্ন দলের রাজনীতিতেও শীর্ষ পদ ধরে রেখেছেন।

বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত তিন থেকে চারটি পরিবারের মধ্যে নিয়ন্ত্রিত। সেই হিসেবে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ নিয়ন্ত্রণ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবার। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পরিবার নিয়ন্ত্রণ করে বিএনপি। এরশাদ নিয়ন্ত্রণ করেন জাতীয় পাটি। এছাড়া এই দলেও বাইরেও ছোট কিছু দল নিয়ন্ত্রণ করে টাঙ্গাইলের সিদ্দিকী পরিবারসহ আরো অনেক পরিবার রয়েছে।

পাশাপাশি বড় দল গুলোর বিভিন্ন এলাকাও দুই একটি পরিবার নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবার।

দেখা গেছে, এবার সংসদীয় ৩০০টি আসনে নিচের ৬টি পরিবার (রক্ত ও বৈবাহিক সূত্রে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ) মোট ৩৩টি আসনে প্রার্থী হয়েছেন। নির্বাচনে এদের সবাই বিজয় হলে ১০% শতাংশ সংসদীয় আসন হবে তাদের দখলে।

তবে এবার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাত্র একটি প্রার্থী রয়েছেন। ১৯৯১ সাল থেকে দেশে অনুষ্ঠিত প্রতিটি নির্বাচনে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পরিবারের একাধিক ব্যক্তি অংশ নিলেও এবারের অবস্থা পুরাটাই আলাদা। নীলফামারী-১ আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী রফিকুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি খালেদা জিয়ার ছোট বোন সেলিনা ইসলাম বিউটির স্বামী।

এবার ১৯ আসনে প্রার্থী বঙ্গবন্ধুর আত্মীয়-পরিজন: একাদশ জাতীয় নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জ-৩ ও রংপুর-৬ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চাচাত ভাই শেখ আবু নাসেরের ছেলে সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দীন এবং তার ছেলে শেখ সারহান নাসের তন্ময়। শেখ হেলাল উদ্দীন বাগেরহাট-১। তার ছেলে তন্ময় বাগেরহাট-২ আসন থেকে নির্বাচন করবেন । আর তার মেঝ চাচা শেখ সালাউদ্দিন জুয়েল লড়বেন খুলনা-২ আসনে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ বরিশাল-১ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচন করবেন। তার ছোট বোনের দেবর হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ কুষ্টিয়া-৩ আসনে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আরেক ফুফাতো ভাই সাবেক এমপি প্রয়াত ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরীর বড় ছেলে নূর-ই-আলম চৌধুরী (লিটন চৌধুরী) এবারের নির্বাচনে মাদারীপুর-১ আসনের প্রার্থী।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আরেক ফুফাতো ভাই শেখ ফজলুল করিম সেলিম যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ ফজলুল হক মনির ছোট ভাই গোপালগঞ্জ-২ আসন থেকে নির্বাচন করছেন। আর জামালপুর-১ (দেওয়ানগঞ্জ-বকশীগঞ্জ) আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন শেখ সেলিমের ভায়রা আবুল কালাম আজাদ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনির ছেলে শেখ ফজলে নূর তাপস ঢাকা-১০ আসনে আওয়ামী লীগের হয়ে নির্বাচন করছেন। এবার শেখ হাসিনার প্রয়াত স্বামী ওয়াজেদ মিয়ার বড় বোনের নাতনি হলেন মাহবুব আরা গিনি গাইবান্ধা-২ আসনে (সদর) আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন।

ফরিদপুর-৩ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের শ্বশুর। আর মোশাররফ হোসেনের মেয়ের জামাই অধ্যাপক ডা. হাবিবে মিল্লাত মুন্না সিরাজগঞ্জ-২(সদর-কামারখন্দ)আসন থেকে নির্বাচন করবেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার খালা শাশুড়ি হচ্ছেন আইভী রহমান। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ও আইভী রহমানের সন্তান হলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন কিশোরগঞ্জ-৬ (ভৈরব-কুলিয়ারচর) আসনে নির্বাচন করবেন।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও বর্তমান শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু নির্বাচন করবেন ঝালকাঠি-২ আসনে। তিনি সম্পর্কে শেখ হাসিনার ফুফা। আমির হোসেন আমুর প্রয়াত স্ত্রী ফিরোজা হোসেন সম্পর্কে শেখ হাসিনার ফুফু।

অন্যদিকে, বিরোধী জোটে হলে জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ একটিকে শেখ হাসিনা ভাগ্নে। অন্যদিকে, শেখ হাসিনা হচ্ছেন পার্থের ফুফা শাশুড়ি। কেননা পার্থের আপন মামা হচ্ছেন শেখ সেলিম। আর বাগেরাটের শেখ হেলাল হচ্ছেন তার শ্বশুর। তিনি লড়বেন ভোলা-১ আসন থেকে।

শেখ সেলিমের ছেলে বিয়ে করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর মেয়েকে। টুকু) সিরাজগঞ্জ-২ আসনে মনোনয়নপত্র নিলেও তারটা বাতিল করা হয়েছে। তার তার স্ত্রী অর্থাৎ শেখ সেলিমের বিয়াইন রোমানা মাহমুদ বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আছেন। আবার শেখ সেলিমের আরেক ছেলে বিয়ে করেছেন আলোচিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসেরের মেয়েকে। মুসা বিন শমসেরের ছেলে ববি হাজ্জাজ হারিকেন প্রতীক নিয়ে ঢাকা-৬ আসনে গণঐক্য জোট গঠন করে নির্বাচন করবেন।

দুই আসনে প্রতিবারে মতো এবারও নারায়ণগঞ্জে রাজনীতির মাঠে ওসমান পরিবার। নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শামীম ওসমান। তার ভাই একেএম সেলিম ওসমান নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে লড়বেন।

৭ আসনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পরিবারের সদস্যরা। এরশাদ ঢাকা-১৭ (গুলশান-ক্যান্টনমেন্ট-ভাষানটেক) আসনে ও রংপুর-৩ থেকে নির্বাচন করবেন। তার আপন ভাই গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদের জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান লালমনিরহাট-৩ আসন থেকে নির্বাচন করবেন।

আর এরশাদের স্ত্রী ও বর্তমান সংসদের বিরোধীদলীয় প্রধান রওশন এরশাদ ময়মনসিংহ-৪ ও ময়মনসিংহ-৭ আসন থেকে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। এরশাদের ভাগনি জামাই ও পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু রংপুর-২ (বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জ) আসন থেকে নির্বাচন করছেন।

৩ আসনে টাঙ্গাইলের প্রভাবশালী সিদ্দিকী পরিবার। এ পরিবারের দুই সন্তান আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী আর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী (বীরউত্তম)। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী টাঙ্গাইল-৪ ও ৮ আসনে মনোনয়ন নিয়েছিলে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে। কিন্তু ঋণ খেলাপির কারণে তার উভয় মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। অবশ্য টাঙ্গাইল-৮ আসনে তার মেয়ে ব্যারিস্টার কুঁড়ি সিদ্দিকীর মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে। আর টাঙ্গাইল-৪ আসনে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রার্থী কাদের সিদ্দিকীর ছোট ভাই আজাদ সিদ্দিকীর মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে।

অন্যদিকে, কাদের সিদ্দিকীর বড় ভাই আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সাবেক সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী টাঙ্গাইল-৪ আসনে এবং ছোট ভাই মুরাদ সিদ্দিকী টাঙ্গাইল-৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন।

বি. চৌধুরীর পরিবার থাকছে একটি আসনে। সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী যুক্তফ্রন্ট গঠন করে এবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট থেকে নির্বাচন করছেন। তবে বি. চৌধুরী কোনো মনোনয়ন নেননি। তার ছেলে দলটির যুগ্ম-মহাসচিব ও যুক্তফ্রন্টের মুখপাত্র মাহী বি. চৌধুরী মুন্সীগঞ্জ-১ ও ঢাকা-১৭ আসন থেকে মনোনয়ন নিয়েছেন। তবে মহাজোট থেকে তাকে মুন্সীগঞ্জ-১ আসন থেকে মনোনয়ন দেওয়া হবে।

 

আরও পড়ুন

হেলমেট পরিহিত সেই যুবক আটক

হিরো আলমের মনোনয়নপত্র আপিলেও বাতিল

Syed Hasibul

হিরো আলমের নির্বাচন করতে আর কোন বাধা থাকল না

Syed Hasibul