বিনোদন

ভয়ংকর দুলাভাই

আপুর বিয়ের দুদিন আগে থেকে খেয়াল করছি, দুলাভাই আমার দিকে কেমন করে যেন তাকান। মাঝে মাঝে মনে হয়, আপুর চেয়ে উনি আমার দিকে বেশি ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকেন। উনার ভাবখানা এমন যেন কিছুই বোঝেন না। খুব সহজ-সরল। আমার আপুও খুব সোজা-শান্ত। তাই দুজন মিলবে ভালো, এই ভেবে বাবা বিয়ে ঠিক করেন। আমার অবশ্য খানিকটা অমত ছিল।

যাই হোক, বিয়ে হয়েছে প্রায় দুই মাস। এ নিয়ে দশ থেকে বারোবার উনি আমাদের বাড়ি এসেছেন। আমি ঘরে থাকলে দিন নাই-রাত নাই, যখন-তখন নক না করে সোজা ঘরে ঢুকে খেজুরে আলাপ শুরু করে দিতেন। আলাপের সারমর্ম—আমি যেন তাঁকে বন্ধু ভাবি, বিপদে-আপদে স্মরণ করি। ইদানীং মাঝরাতে আপুকে ঘুমের ঘোরে ঘরে একলা ফেলে আমার ঘরে চলে আসেন! নানা ছুতায় স্পর্শ করতে চান। খুব জঘন্য মনে হয় আমার। মাঝে মাঝে দরজা লক করে ঘুমাই। কিংবা আসতে দেখলে বাথরুমে বসে থাকি। কলেজ থাকলে আমাকে আনতে কলেজেও চলে যান। আমি কোচিং কিংবা বান্ধবীর বাসায় গেলে উনি গিয়ে গেটে দাঁড়িয়ে থাকেন। উনার সঙ্গে আসতে না চাইলে নানাভাবে আমাকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন। বলেন, ‘আমি তো তোমার ফ্রেন্ডের মতো। দুলাভাই হয়েছি তো কী হয়েছে!’

এবার মনে হলো আড়ালে লুকিয়ে অনেক হয়েছে। অনেক সম্মান দিয়েছি। আমার বিনয়কে উনি দুর্বলতা ভেবে বসেছেন। প্রথমে খুব টেকনিক্যালি উনাকে বোঝাতে চেষ্টা করি, ‘দুলাভাই মানে ভাইয়া। ভাইয়ারা ফ্রেন্ড হয় না। আমার কোনো ভাই নাই, আপনি আমার একমাত্র ভাই। ভাই-বোনের সম্পর্ক পবিত্র একটা সম্পর্ক।’

—তোমাকে এত জ্ঞান দিতে বলেছি নাকি? আমি জানি, দুলাভাই মানে কী! কিন্তু তুমি জানো শ্যালিকা মানে কী? বউয়ের হাফ। মানে তুমি আমার অর্ধেক বউ হও। হা হা হা।

শুনে রক্ত গরম হয়ে যায়। আমি আপুর মতো সোজা নই। উনি আমাকে একটা বললে, পাল্টা জবাব দিয়ে দিই। তা-ও উনার আক্কেল হয় না। এভাবে চলতে চলতে উনার ওপর খুবই বিরক্ত হয়ে পড়ি। জানি, এখন পরিবারে কাউকে বললে দোষটা আমার ওপর আসবে। হয়তো আপুও আমাকে ভুল বুঝবে। তাই, যা করার আমাকেই করতে হবে। কিছুদিন আগে উনি আমাকে শপিং মল থেকে পিকআপ করতে গিয়েছিলেন। বারণ করায় আমায় এক প্রকার থ্রেট দেন—‘বাবাকে বলব, তুমি আমাকে রাত-বিরাতে মিসকল দিয়ে ডিস্টার্ব করো। তারপর বাকিটা তো বুঝতেই পারছ আশা করি।’

রীতিমতো চমকে যাই উনার এই মিথ্যা ধমকে; কিন্তু ভয় পাই না। এভাবে কোনো মানুষ কাউকে ফাঁসাতে পারে? মা-বাবা উনাকে ‘জামাই জামাই’ করে মাথায় তুলে রাখে। এত দিনের সব রাগ কেমন যেন চেপে বসে আর বলে ফেলি, ‘তো বলেন না। বারণ করছে কে? আপনার এই ঘরে সাধু সাজা, বাইরে আমার সঙ্গে রং-তামাশা করার ধান্ধা আমি বুঝি না ভেবেছেন? আপনাকে আমার গুণ্ডা মনে হয়। রেপিস্ট মনে হয়। আপনি যতই কিছু বলেন, দিনশেষে ওটা আমারই পরিবার। আপনি তাদের কুলাঙ্গার জামাই।’

এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে দম নিলাম। দুলাভাই আমার দিকে তাকিয়ে শুধু হাসি দিলেন। যেন রাক্ষুসে হাসি। কিছু একটা ঘুরছে উনার মাথায়। যেন মুহূর্তে কিছু বলবে না, খানিক বাদে করে দেখাবে। দেরি না করে রিকশা নিয়ে বাসায় রওনা দিলাম।

দুদিন পরের ঘটনা। রিকশায় যাচ্ছিলাম। বাইকে করে দুটি ছেলে রিকশা ক্রস করছিল। এমন সময় ঝুলে থাকা আমার ওড়না ধরে হেঁচকা টান দেয়। সতর্ক ছিলাম। তাই খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। শেষে বুঝতে পারলাম, কাজটি করেছিলেন আমার দুলাভাই!

রিকশাওয়ালার পরামর্শ আর সাহায্যে থানায় অভিযোগ জানিয়ে আসি। বাইকের নাম্বার থেকে শুরু করে সব বর্ণনা রিকশাওয়ালাই দিয়েছিলেন। মন চাইছিল উনার জন্য কিছু করি। তাঁকে একটা দোকানে নিয়ে গেলাম। উনার জন্য শার্ট দেখতেই উনি বললেন, ‘যদি কিছু মনে না করেন, একখান কতা কই?’

—হুম, বলেন।

—আমারে কিছু না দিয়া যদি আমার বউয়ের লাইগা একখান শাড়ি দিতেন। আমার এইডাসহ দুইডা শার্ট আছে। আমার লাগব না। আর আমার বউডার ফাডা-ছিঁড়া মিইল্লা দুইখান মাত্র শাড়ি।

—আচ্ছা। আপনার বউয়ের পছন্দের রং তো আমি জানি না। আপনি পছন্দ করে নেন। আমি বিল দিয়ে দিব। আর হ্যাঁ, আপনার জন্যও একটা শার্ট দেখেন।

—আপনি অনেক ভালা আফা। আপনার কতা আইজকা আমার বউডারে কমু।

—হা, হা। আপনিও অনেক ভালো ভাইয়া। আপনি আজ থেকে আমার ভাই, কেমন?

—আমি সামান্য রিসকা চালাই। আমি কেমতে আপনার ভাই হমু?

—তো কী হইছে! ভাই তো ভাই-ই হয়। কিছু কুলাঙ্গার দুলাভাই নামক রেপিস্টও হয়।

—শেষের কথাডা বুঝলাম না, আফা।

—কিছু না ভাইয়া, আপনি পছন্দ করেন।

আমার কোনো আফসোস নেই, একজন রিকশাচালককে ভাই ডেকেছি। আফসোস তো ছোটবেলা থেকে, যে বোনজামাই হয়ে আসবে, তাকে ভাই বানানোর বড় শখ ছিল। কিন্তু কী ভাবলাম আর কী হলো!

—সোহানা পাহরিন

বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি
-ফেসবুক থেকে পাওয়া

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy