রাজনীতি

সারাদেশে আওয়ামী লীগের ৪ হাজার ২৩ জন ও বিএনপির ৪ হাজার ১১২ জন মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। সারাদেশে আওয়ামী লীগের ৪ হাজার ২৩ জন ও বিএনপির ৪ হাজার ১১২ জন মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন।চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনের বিপরীতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মনোনয়ন চাইছেন মোট ৩২৮ জন। অর্থাৎ প্রতি আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সংখ্যা গড়ে ২০ জনের বেশি।

 বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের গড় বয়স বিবেচনায় দেখা গেছে, তাদের অধিকাংশই নির্বাচনের মাঠে নবীন এবং বয়সে তরুণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ তার রাজনৈতিক ইতিহাসে খুব গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছে। এটা এমন একটা সময় যখন দেশের সব রাজনৈতিক দলেই বিপুল সংখ্যক বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের একবারে শেষ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে। তাই তরুণরা সেই স্থানে নিজেদের জায়গা করে নিতে আগামী নির্বাচনকে পথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

এ ছাড়া ২০১৪ সালে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন, স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকা না থাকা, বর্তমান সংসদ সদস্যের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, জনগণ ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনে নিজেকে তুলে ধরার লক্ষ্যে এবার একাদশ জাতীয় নির্বাচনে দেশের সব নির্বাচনী আসনেই একাধিক প্রার্থী মনোনয়নপত্র উত্তোলন করেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার মনে করেন, ‘আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুটি রাজনৈতিক দলেই সাবেক ও বর্তমান এমপি এবং রাজনীতিবিদদের একটি অংশের যথেষ্ট বয়স হয়ে গেছে। রাজনীতিতে পুরাতনরা চলে যাবেন নতুনরা আসবেন। তরুণরা বিষয়টি খেয়াল করেছেন। তাই মনোনয়ন পাবেন কি পাবেন না তার তোয়ক্কা না করেই তারা দলের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করছেন। মূলত তারা আলোচনায় আসার মাধ্যমে নির্বাচনের মাঠে নিজেদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। তাই এবার দুই বড় দলেই তরুণ মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সংখ্যা বেড়েছে।’

আওয়ামী লীগের তরুণ মনোনয়ন প্রত্যাশী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, আমিনুল ইসলাম আমিন, মাহবুব রহমান রুহেল, নিয়াজ মোর্শেদ এলিট ও মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন ২৭ জন তরুণ রাজনীতিবিদ। এদের মধ্যে কেউ ছাত্ররাজনীতি থেকে এসেছেন, কেউ শিল্পপতি আবার কেউ এমপি-মন্ত্রীর সন্তান।

এদের মধ্যে রয়েছেন- চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনে মাহবুব রহমান রুহেল ও তরুণ ব্যবসায়ী নিয়াজ মোর্শেদ এলিট, চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে খাদিজাতুল আনোয়ার সানি ও কাজী মো. তানজিবুল আলম, চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে ব্যবসায়ী দিদারুল আলম ও উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম আল মামুন। চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি মুহাম্মদ সালাউদ্দিন চৌধুরী ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপকমিটির সম্পাদক নাছির হায়দার বাবুল। চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন এবং ওসমান গণি।

চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী) আসনে নুরুল ইসলাম বিএসসির ছেলে মুজিবুর রহমান ও নওশাদ মাহমুদ রানা। চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) আসনে ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, জসীম উদ্দিন চৌধুরী, আবদুল লতিফ টিপু, চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী, রিয়াজ হায়দার চৌধুরী ও হাসান মনসুর। চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং) আসনে হেলাল উদ্দিন চৌধুরী তুফান, মহিউদ্দিন বাচ্চু ও ফরিদ মাহমুদ। চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে সাইফুদ্দিন খালেদ বাহার। চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে নাজমুল করিম চৌধুরী ও কেন্দ্রীয় বদিউল আলম। চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনে শাহজাদা মহিউদ্দিন, চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনে আমিনুল ইসলাম আমিন, মো. মাঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরী ও অহিদ সিরাজ স্বপন।

চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং) আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ফরিদ মাহমুদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন ফরম উত্তোলন করায় দলের মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা বেশি হচ্ছে। আমার মনে হয় না এতে দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ সবাই তো বঙ্গবন্ধুর আর্দশের রাজনীতি করেন। তাই দলীয় প্রার্থীকে মেনে নিয়ে সবাই নৌকার জন্য কাজ করবেন।’

এদিকে আওয়ামী লীগের মতই বিএনপিতেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ মনোনয়ন প্রত্যাশী। তারা হলেন-চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনে সরোয়ার উদ্দিন সেলিম, উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুল আমিন, চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুন্ড-পাহাড়তলী) আসনে নগর যুবদলের সভাপতি মোশাররফ হোসেন দিপ্তি, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-সভাপতি ফেরদৌস মুন্না। চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য ভাইস ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিন। চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী, উত্তর জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি জসিম সিকদার।

চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে হুম্মাম কাদের চৌধুরী, এস এ মুরাদ চৌধুরী। চট্টগ্রাম-৮(বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনে এরশাদ উল্লাহ। চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী) আসনে শোয়েব রিয়াদ, সাবেক মহানগর যুবদল সভাপতি কাজী বেলাল উদ্দীন, চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর, শোয়েবুর রহমান খসরু। চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে গাজী সিরাজ উল্লাহ, স্বেচ্ছাসেবক দলের দক্ষিণ জেলা সভাপতি সাইফুদ্দীন সালাম মিঠু, চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনে অ্যাডভোকেট লোকমান শাহ, চট্টগ্রাম-১৫ (লোহাগাড়া-সাতকানিয়া) আসেন ব্যারিস্টার মোহাম্মদ ওসমান চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে আলোচিত বিএনপি নেতা চেয়ারম্যান লেয়াকত আলী।

বিএনপির তরুণ মনোনয়ন প্রত্যাশী মোশারফ হোসেন দিপ্তী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা, গাজী সিরাজ উল্লাহ ও সাইফুদ্দীন সালাম মিঠু

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদল নেতা ও চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী সাইফুদ্দীন সালাম মিঠু বলেন, ‘দলের মধ্যে তরুণদের মনোনয়ন চাওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক। অগণতান্ত্রিক সরকারকে সরানোর জন্য এবারের নির্বাচনে চট্টগ্রামে একাধিক আসনে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র উত্তোলন করেছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ রাজনীতিবিদ। এর মাধ্যমে তরুণরা জানান দিচ্ছেন বিএনপি মাঠেই আছে, তরুণ নেতৃত্বই বিএনপিকে এগিয়ে নিচ্ছে। অধিক সংখ্যক মনোনয়ন প্রত্যাশীর কারণে দল কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। মনোনয়ন নিশ্চিতের পর সবাই ধানের শীষ প্রতীককে বিজয়ী করতে সম্মিলিতভাবে কাজ করবেন। যাকে মনোনয়ন দেয়া হবে সবাই সেই প্রার্থীকে মেনে নেবে। আমাদের সবার লক্ষ্য একটাই।’

তবে অনেকে মনে করেছেন, এসব মনোনয়ন প্রত্যাশীদের একাংশ ভাবছেন ২০১৪ সালের মতো একটি নির্বাচন হবে এবং সেখানেই বাজিমাত করবেন তারা। মূলত ভোট ও রাজনীতির বাস্তবতা সম্পর্কে অনেকের ধারণা না থাকায় তারা এভাবে মনেোনয়ন পেতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন।

সারাদেশে ৩০০ আসনে শুধু আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন ৮ হাজারের বেশি মনোনয়ন প্রত্যাশী। এসব মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে বর্তমান ও সাবেক মন্ত্রী, এমপি, কেন্দ্রীয়, মহানগর ও বিভিন্ন সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতা, জেলা-উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, সাবেক পুলিশ অফিসার, ব্যবসায়ী, ছাত্রনেতা, যুবনেতা, অভিনেতা-অভিনেত্রী, গায়ক-গায়িকা কে নেই?

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম জেলার সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশে একটি পরিবর্তন হচ্ছে। তবে সেটা গুণগত পরিবর্তন কিনা সেটা সময় বলবে। তরুণদের রাজনীতিতে আসা আশার দিক। কিন্তু তারা কী কারণে রাজনীতিতে আসতে চাইছেন তা ভেবে দেখতে হবে। দেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন আনতে না নিজে এমপি হতে?’

তিনি আরও বলেন, ‘এদেশে সবকিছুই ক্ষমতাকেন্দ্রিক। সবাই ক্ষমতার মালিক হতে চায়। যারই কিছু অর্থ ও পরিচিতি আছে সে আরও ক্ষমতা পেতে মরিয়া। বাংলাদেশে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক হন স্থানীয় এমপিরা তাই সবারই আগ্রহ এমপি হওয়া। তারা ভাবছেন একবার এমপি হতে পারলেই নিজের ক্ষমতা নতুন মাত্রা পাবে। এতে জনগণের বা এলাকার কী উন্নয়ন হবে তা এসব নেতার ভাবেন বলে মনে হয় না।’