রাজনীতি

ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী (নিক্সন)দুর্গত মানুষের পানে ছুটে চলাই যেন তার কাজ

দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের উন্নয়ন বঞ্চিত মানুষগুলোর মাঝে হঠাত্ করে আশাজাগানিয়া হয়ে এলেন এই তরুণ নেতৃত্ব। যিনি ছুটে চলেন নদী ভাঙনের কবলে পড়া প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে গ্রামে। দুর্গত মানুষের পানে ছুটে চলাই যেন তার কাজ।

তাই সব বয়সী মানুষের কাছে তুমুল জনপ্রিয় ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী (নিক্সন)। এই তরুণ জনপ্রতিনিধি কথা বলেছেন আমাদের এবারের প্রজন্মে। জানিয়েছেন রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন

অভিজ্ঞতাসহ তরুণদের নানা বিষয়ে তার মতামত। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন রিয়াদ খন্দকার

বেড়ে ওঠার গল্প

আমার ছোটবেলা কেটেছে রাজধানীর ধানমন্ডিতে। স্কুল ছিল ধানমন্ডি গভর্নমেন্ট বয়েজ স্কুল। স্কুল শেষে আবহানী মাঠে ফুটবল খেলতে যেতাম। তখন আবাহনী ক্লাবে মুন্না ভাই, আসলাম ভাইয়েরা প্র্যাকটিস করত। তখন তো তারা ফুটবলের সুপারস্টার। প্র্যাকটিসের সময় দলে খেলোয়াড় কম পড়লে আমাদের নিত খেলায়। ওই সময়টা আমার জন্য রোমাঞ্চকর ছিল। আমার বাবা (সাবেক সাংসদ প্রয়াত ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী) খুলনা আবাহনীর প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আমৃত্যু তিনি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা। বন্ধুরা মিলে কোথাও আড্ডায় বসলে অনায়েশেই ১০০/১৫০ জনের জমায়েত হয়ে যেত। ছোটবেলাটা বলতে গেলে এই ধানমন্ডি কেন্দ্রিকই ছিল। এখনো সময় পেলে রাতে একা একা ধানমন্ডিতে ঘুরতে যাই।

রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততা

সাত ভাইবোনের মাঝে আমি সবার ছোট ছিলাম, তখন আমার বয়স ছয় কি সাত, বাবা তখন মাদারীপুর জেলা আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটিরও সদস্য ছিলেন। তখন থেকেই বাবা সাথে করে ঢাকার বাইরে রাজনৈতিক প্রোগ্রামগুলোতে নিয়ে যেতেন। বাবার সাথে মিটিং-মিছিল সবকিছুতেই আমি গিয়েছি। আমার পরিবারের (চাচা, মামা, খালা) প্রায় সবাই রাজনীতিবিদ। ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার খুব কম আছে। মূলত, আমার বেড়ে ওঠাটাই রাজনৈতিক আবহে হয়েছে, তাই রাজনীতি ছাড়া অন্য কিছু করার কথা কোনো দিন চিন্তাও করিনি। স্কুল শেষে ঢাকা কলেজে যাওয়ার পর রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হলাম। ঢাকা কলেজে যখন ভর্তি হই, তখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল এবং তত্কালীন ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন নাসিরুদ্দিন পিন্টু। এটা ১৯৯৩ সালের কথা। তখন ঢাকা কলেজের ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের নাম নেওয়ার মতো কেউ ছিল না। আমাদের পুরো ব্যাচটা যখন ঢাকা কলেজে ঢুকলাম, তখন আস্তে আস্তে ছাত্রলীগ গঠন, কমিটি দেওয়া থেকে শুরু করে পরবর্তীতে তা স্ট্রং করা হলো। এর জন্য অনেক মামলা-হামলায় আক্রান্ত হতে হয়েছে। তারপর থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সরাসরি জড়িত ছিলাম। পরে আমার বড়ভাইয়ের সাথে অনেকটা সময় রাজনীতিতে ছিলাম।

অবসরে যা করেন

খুবই কম অবসর মেলে, যতটুকু পাই পরিবারকে দেওয়ার চেষ্টা করি। স্ত্রী, ছেলে মেয়ের সঙ্গে ড্রাইভে যাওয়া বা সময় কাটানোটাই মূল চিন্তা থাকে।

নিজের ভালোমন্দের খোঁজ

নিজের মাঝে ভালো খোঁজাটা খুব কষ্টকর। যদি বলতেই হয় তাহলে, প্রথমত আমি মানুষকে খুব ভালোবাসি। আমার তিন থানার মানুষ আমার আপনজন হয়ে গেছে। আমি খুব স্ট্রেট রাজনীতি করি, গেম খেলতে পছন্দ করি না। আমার এলাকার জনগণের জন্য কিছু করতে পারলে আমি খুব শান্তি পাই। আমি কখনো চিন্তা করি না ভালো কাজ করার জন্য আমার ওপর কী কী বিপদ আসতে পারে। আমার দাদি-নানি, বাবা সবার কাছে বঙ্গবন্ধুর গল্প শুনে শুনে বড় হয়েছি। তাঁর ভিতরে যে দেশপ্রেম, নেতৃত্ব গুণ, সর্বোপরি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পিছনে তার যে ভূমিকা—এগুলো আমাকে বরাবরই অনুপ্রাণিত করে অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করতে। আর মন্দ দিক বলতে গেলে, খুব কম সময়ে রেগে যাই। আর কেউ যদি আমাকে একবার ঠকায় তাহলে তার সাথে আর সম্পর্ক রাখি না। একদম মনে প্রাণে তাকে ঘৃণা করি। মূলত অভিনয়টা আমি করতে পারি না।

নেতৃত্বে তরুণদের অংশগ্রহণের বিষয়টি যেভাবে দেখেন

রাজনীতি শুধু প্রবীণ রাজনীতিবিদরাই করবে, এটা ঠিক না। তরুণেরা রাজনীতিতে আসবে, রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হবে—এটাই স্বাভাবিক। ছাত্র রাজনীতির বিশাল গুরুত্ব রয়েছে। আর প্রবীণদেরও রাজনীতিতে খুব দরকার। তাদের কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছু শিখতে হয়। প্রবীণের অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের শক্তির সম্মিলনই রাজনীতিকে সত্যিকারের পূর্ণতা দেয়।

তরুণদের কাছে প্রতিশ্রুতি

আমার এলাকার তরুণদের কাছে আমার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রথমটি হলো শিক্ষাক্ষেত্রে শতভাগ নিশ্চয়তা প্রদান। আরেকটি হলো, আমার এলাকাকে আমি মাদকমুক্ত করতে চাই। অন্তত আমার যে তিনটি থানা রয়েছে, তা আমি মাদকমুক্ত দেখতে চাই। মাদকের কারণে তরুণদের জীবনটাই শেষ হয়ে যাচ্ছে।

যে পদক্ষেপটি খুব দ্রুত নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন

এয়ারপোর্টে প্রবাসীদের নানা হেরেসমেন্টের শিকার হতে হয়। এক্ষেত্রে তাদের জন্য আমাদের কিছু ভিআইপি সার্ভিস দেওয়া উচিত। বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান রেখে বিদেশের মাটিতে শারীরিক-মানসিক কষ্টে থেকে উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠাচ্ছে, তাদের এই রেমিটেন্সের টাকায় দেশের চাকা সচল থাকে, আর তাদের প্রতিই এমন আচরণ সত্যি কষ্টকর। অথচ যখন দেখি আমার মতো সংসদ সদস্যদের নানাবিধ আত্মীয়রা ভিআইপি সার্ভিস পাচ্ছে তখন খুব খারাপ লাগে। আমি সরকারকে বারবার বলছি প্রবাসীদের আমাদের দেশে ভিআইপি সার্ভিস দিতে হবে। প্রয়োজনে এ নিয়ে আন্দোলনও করব।

ভবিষ্যত্ রাজনৈতিক পরিবেশ যেমন দেখতে চান

আমাদের রাজনৈতিক পরিবেশ এমন হয়ে গেছে যে, এই দল ক্ষমতায় আছে তো অন্য দলকে নিঃশেষ করে ফেলতে হবে। আমি পজিটিভ কিছু করলে পরে আরেক দল ক্ষমতায় এসে তা বন্ধ করে দেবে। কোনো উন্নয়নমূলক কাজ ৭০ ভাগ হয়ে গেছে, নির্বাচনে অন্য দল ক্ষমতায় এলো, এরপর সে কাজটা বন্ধ হয়ে গেল, সেই সাথে উন্নয়নের পথও কিন্তু বন্ধ হয়ে গেল। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের আদর্শ আলাদা হবে, নীতি আলাদা হবে—এগুলো নিয়ে যৌক্তিক তর্ক হবে; কিন্তু সকলের মাঝে সুন্দর একটি সামাজিক সম্পর্ক থাকবে। এটাই তো গণতন্ত্র। আমার বাবার কাছে দেখেছি আওয়ামী লীগ, বিএনপির বড় বড় নেতারা আসতেন। আমারও অনেক বন্ধু আছে যারা এখন বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত, তাই বলে কি আমি মুখ দেখা বন্ধ করে দেবো বা দুজন একসাথে চা খেলে দালাল হয়ে যাব। এই সব মানসিকতার আমূল পরিবর্তন করতে হবে। পাশের দেশ ভারতে দেখি তাদেরও দল পরিবর্তন হয় কিন্তু নীতি পরিবর্তন হয় না। অগ্রজরা আমাদের জন্য কি রাজনীতি রেখে যাচ্ছে? তরুণরা এখান থেকে কী শিখবে? সেটাই এখন দেখার বিষয়। হানাহানি বাদ দিয়ে সবার লক্ষ্য হতে হবে দেশে আগামীতে কীভাবে আরও উন্নয়ন করা যায়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ছিল দুখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। সেই হাসি ফোটাতে হবে।