জাতীয়

আবরারের লাশ সিঁড়িতে রেখে টিভিতে খেলা দেখে খুনিরা

একজন নিরীহ ছাত্র। তার ওপর অন্তত ডজন খানেক মানুষরূপী হায়েনার নির্যাতন। লাঠি, স্ট্যাম্পের আঘাতে রক্তাক্ত আবরার ফাহাদের পুরো শরীর। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা নরপশুদের আদিম উল্লাস। এরপর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন বর্ষের নেতারা এসে পালাক্রমে পিটায় আবরারকে। বিরামহীন পিটুনিতে নেতিয়ে পড়ে আবরার। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা আবরারের মৃত্যু গোঙানিও খুনিদের মনে এতটুকু দাগ কাটেনি। জাগেনি বিন্দুমাত্র দয়া।

বরং মৃত ভেবে তাকে ধরাধরি করে সিঁড়িতে রেখে নিশ্চিন্তে টেলিভিশনে লা লিগার ফুটবল ম্যাচ দেখছিল তারা। এমনকি সেখানে রাতের খাবারও খেয়েছে পাষণ্ড ঘাতকরা। হত্যাকাণ্ডের দিন হলে অবস্থান করা শিক্ষার্থীরা এমন তথ্য জানিয়েছেন। ঘাতক সন্দেহে এমন ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের অনেকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা বর্ণনা দিয়েছে কি নির্মমতায় হত্যা করা হয়েছে আবরারকে। আবরার

থাকতেন শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর রুমে। রোববার বিকালে পলাশী থেকে চা নাস্তা খেয়ে রুমে যান আবরার। এরপর সাড়ে ৭টার দিকে তাকে ডেকে পাঠান বড় ভাইয়েরা। ২০১১ নম্বর রুমে তাকে ডেকে নেন ৩ জন। এরপর সেখানে আবরারের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও ম্যাসেঞ্জার পরীক্ষা করেন তারা। এরপর তার সর্বশেষ ফেসবুক স্ট্যাটাস নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ওই স্ট্যাটাস নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর্যায়ে তাকে মারধর শুরু করে উপস্থিত ছাত্রলীগ নেতারা।

কয়েক ঘণ্টা ধরে থেমে থেমে চলে নির্যাতন। রাত ১০ টার দিকে আবরারের কাপড় নিয়ে যান তারা। আবরারের এক বন্ধু বলেন, ধারণা করি রক্তাক্ত হয়েছে আবরার। ২০১১ নম্বরের পাশের রুম ২০১০ নম্বর থেকে শোনা যাচ্ছিল চিৎকারের শব্দ। একাধিক শিক্ষার্থী জানান, এই রকম রুমে ডেকে নিয়ে নির্যাতনের চিত্র এটিই নতুন না। আগেও হয়েছে। আবরারের সেই বন্ধু রাত ২ টার দিকে চিৎকার শুনে ছুটে গিয়ে দেখেন, তোশকের মধ্যে শোয়ানো আবরার।

ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন। বলছিলেন, আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও। এরকিছু সময় পর অ্যাম্বুলেন্স ও ডাক্তার আসার আগেই না ফেরার দেশে চলে যান আবরার। সোমবার এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৯ জনকে আসামি করে চকবাজার থানায় একটি মামলা দায়ের করেন আবরারের বাবা। সেদিনই ছাত্রলীগের ১০ নেতা কর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

গোয়েন্দা পুলিশের ঊর্দ্ধতন এক কর্মকর্তা বলেন, তারা প্রত্যেকেই হত্যার কথা স্বীকার করেছে। তিনি আরো বলেন, আবরারকে ইয়ার বাই ইয়ার পিটানো হয়। কয়েকজন করে দলে ভাগ হয়ে। দ্বিতীয় বর্ষ থেকে চতুর্থ বর্ষ পর্যন্ত সবাই তাকে আঘাত করে। তাদের প্রত্যেকের ১০ দিনের রিমাণ্ড আবেদন করার প্রেক্ষিতে আদালত ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

তদন্ত ঘনিষ্ট একটি সূত্র জানায়, প্রথমে আবরারকে পেটায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের আইন বিষয়ক উপ-সম্পাদক। পরে উপ-দপ্তর সম্পাদক ও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র মুজতবা রাফিদ, সমাজসেবা বিষয়ক উপ-সম্পাদক ও বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র ইফতি মোশারফ সকালসহ আরো অনেকে তার ওপর নির্যাতন চালায়। এছাড়াও তাদের সঙ্গে ছিলেন তৃতীয় বর্ষের বেশ কজন শিক্ষার্থী।

এরপর পেটানো শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী অনীক সরকার, ক্রীড়া সম্পাদক ও নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একই বর্ষের মেফতাহুল ইসলাম জিয়নসহ কয়েকজন।

জানা যায়, তারা সকলেই বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেলের অনুসারী। এই ঘটনায় আটক ১০ ছাত্রলীগ নেতাকর্মী হলেন, বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফুয়াদ হোসেন, অনীক সরকার, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, ইফতি মোশারেফ, বুয়েট ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন, গ্রন্থ ও প্রকাশনা সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ মুন্না, ছাত্রলীগের সদস্য মুনতাসির আল জেমি, খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর ও মোহাজিদুর রহমান। এরপর গতকাল ফের দুইজনকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ।

নির্যাতনে জড়িত অমিত সাহার নাম আসলেও মামলায় তার নাম নেই। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। জিয়নকে সোমবার পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করে। প্রায় ১৫ মিনিটের জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। পুলিশের গাড়িতে যাবার সময় জিয়নের মুখে ছিলো না কোন ভীতির ছাপ। জিয়নের হাসিমাখা মুখের ছবি ফেসবুকে হয়েছে ভাইরাল। ঘটনার সময়ের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তিনজন আবরারকে ধরে নিচে নিয়ে আসছেন। আর তাদের পিছনে ছিলেন কয়েকজন।

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy